বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট: হাইকোর্টের রুল এবং সংগঠনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সদস্যবৃন্দ ও সচেতন উপজেলাবাসীর উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিনিধি: বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের পরিচালনা কার্যক্রম নিয়ে সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এখতিয়ারবহির্ভূত ৭জনের নামে দলীল সম্পাদন, অনুমোদন ব্যতিত সংবিধান লঙ্গন করে মূলধন থেকে টাকা উত্তোলন, টাকার হিসেবে মিলিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়ে সরকারি কর্মকর্তাকে বেআইনি ঘুষ প্রদানের স্বীকারোক্তি এবং সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রিট ইস্যুর বিষয়টি সদস্যদের কাছে গোপন রেখে আরেকটি কমিটি সিলেকশনের প্রক্রিয়া শুরু। ট্রাস্ট পরিচালনায় বেআইনি ও বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপে ট্রাস্টের অস্থিত্ব এখন হুমকির মুখে পড়ায় ক্ষোভে ফুসে উঠেছেন ট্রাস্টিরা। এ নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় গোটা বিশ্বনাথ উপজেলার জনসাধারণের মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠান। এতে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের অনেক পরিশ্রম ও আবেগ জড়িত। প্রতি বছর বিশ্বনাথের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এর থেকে লাভবান হচ্ছেন । তাই মৌলিক বিষয়াদিতে ট্রাস্টের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ফায়দা হাসিলের প্রচেষ্টা থেকে একটি মহৎ সংগঠনের কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে চরম ক্ষতি হবে উপজেলাবাসীর এমন আশংকা করছেন সচেতন মহল ।

জানা গেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পরা বিশ্বনাথের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদান ও সাহায্যের কথা চিন্তা করে প্রতিষ্ঠাতাদের কয়েকজনের দীর্ঘ দুই বছরের পরিশ্রমের পর ১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্যে প্রবাসীরা বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মরহুম এম এ মান্নান এবং প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এরপর থেকে বিভিন্ন কার্যকরী কমিটি এই ট্রাস্টের মাধ্যমে বিশ্বনাথ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে বৃহৎ এ সংগঠনটি। ট্রাস্টের কল্যাণে আলোকিত হয়েছে অনেক শিক্ষার্থীর জীবন।

বিগত কমিটি ২০১৫ সালে সংবিধান লঙ্গন করে ট্রাস্টের মূল ধন থেকে প্রায় দশ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে নিয়মবহির্ভূত ৭ জনের নামে বাংলাদেশে একটি দলিল সম্পাদন করার পর থেকে ট্রাস্টে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্পর্কে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। রুলে হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৫ সালে ৭ জনের নামে সম্পাদিত ট্রাষ্টের দলিলের মাধ্যমে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাষ্টের কার্যক্রম কেন বেআইনী হবে না, এই মর্মে কারণ দর্শানোর জন্যে বিবাদীদের প্রতি নোটিশ জারি করেছেন। ২০১৫ সালে নিয়ম বর্হিভূত ও ভুল গঠনতন্ত্র দিয়ে মনগড়াভাবে সাতজন ট্রাষ্টি বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাষ্ট ইউকে’র নামে একটি দলিল সম্পাদন করে বেআইনীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। গঠনতন্ত্রে ট্রাষ্টের মূলধনের লভ্যাংশ থেকে প্রতি বছর ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বৃত্তি বিতরনের বিধান রয়েছে এবং ট্রাস্টের সিংহভাগ সদস্যের সম্মতি ছাড়া মূলধন কোন অবস্থাতেই উত্তোলন করা যাবে না, সংবিধানে এমন একটি মৌলিক বিধিবিধান থাকলেও মির্জা আসহাব বেগ সভাপতি, মো. নজরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক ও মিসবাহ উদ্দিন ট্রেজারার থাকাকালীন সময়ে সংগঠনের সংবিধান ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ট্রাস্টের মূলধন থেকে ৯লাখ ৮৫হাজার টাকা উত্তোলন করেন এবং ৭জনের নামে ট্রাস্টের একটি দলিল সম্পাদন করেন। পরবর্তীতে এই অর্থ কি খাতে ব্যয় হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে বেআইনি ঘুষ প্রদানে এই টাকা খরচ করা হয়েছে বলে তৎকালীন সভাপতি মীর্জা আসহাব বেগ স্বীকারোক্তি প্রদান করেন । ট্রাস্টের টাকার ব্যাপারে তৎকালীন ট্রেজারার মিসবাহ উদ্দিনও কোন সদুত্তর প্রদান করতে পারেন নাই এবং বার্ষিক সাধারণ সভায় এই টাকার হিসেবে মিলিয়ে দিতে ব্যর্থ হোন । এ ঘটনার প্রেক্ষিতে মীর্জা আসহাব বেগ, মো. নজরুল ইসলাম এবং মিসবাহ উদ্দিনের কাছে ট্রাস্টের টাকা ফেরতসহ বেআইনি কার্যক্রমের ব্যাখ্যা চেয়ে যুক্তরাজ্যের একজন আইনজীবীর মাধ্যমে আইনী নোটিশ প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের চ্যারিটি কমিশন ও যুক্তরাজ্য পুলিশের ফ্রড বিভাগেও লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। আইনি নোটিশের সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মতসির খান বাধ্য হয়ে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের তিন সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। রিট পিটিশনে ১৩জনকে বিবাদী করা হয়। তারা হলেন- ১। বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যাণ সচিব, ২। আইন সচিব, ৩। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ৪। নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, ৫। সিলেট জেলা রেজিষ্টার, ৬। সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিস ও এখতিয়ারবহির্ভূত দলিল সম্পাদনকারীদের মধ্যে ৭। মীর্জা আসহাব বেগ, ৮। মো. নজরুল ইসলাম, ৯। ফিরোজ খান পংকী, ১০। সাজ্জাদুর রহমান, ১১। আব্দুর রউফ, ১২। আব্দুল ওয়াহিদ এবং ১৩। মো. রহমত আলী।

উক্ত রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ হাইকোর্ট বেঞ্চ বিবাদীদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। বিচারপতিদ্বয় রুলের আদেশে বলেন, ২০১৫ সালে সম্পাদিত ট্রাস্টের দলিলের মাধ্যমে বেআইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৭ নং থেকে ১৩ নং বিবাদীদের বিরুদ্ধে ৩ নম্বর বিবাদী সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা কেন আইনের বরখেলাপ বলে গণ্য করা হবে না? এই মর্মে কারণ দর্শাতে হবে। এছাড়া ট্রাস্টের নামে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমের বৈধ আইনি ভিত্তি নেই এবং এ ব্যাপারে আদালত কেন যথাযথ ও উপযুক্ত আদেশ প্রদান করবে না, তার জন্য উপযুক্ত কারণ দর্শাতে হবে।

এদিকে, সদস্যবৃন্দ ট্রাস্টের পরিচালনা কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট কর্তৃক রুল জারির বিষয়টি সদস্যদেরকে অবহিত না করে আরেকটি কমিটি সিলেকশনের প্রক্রিয়া শুরু করা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। হাইকোর্টের রুল ইস্যুর বিষয়ে কার্যকরী কমিটির নীরবতা পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। হাইকোর্টের রুলের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে সদস্যদের মৌলিক অধকার ক্ষুন্ন করে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ট্রাস্টের নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম আদালত অবমাননার শামিল হতে পারে বলে মনে করেন অনেকে । ট্রাস্টের পরিচালনা কার্যক্রম নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রুল ইস্যুর খবর মিডিয়াতে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ফোরামে সদস্যবৃন্দ ট্রাস্টের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে ম্যানেজমেন্ট কমিটির দায়িত্বশীলরা আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে তাদের অভিমত ব্যক্ত করছেন । ম্যানেজমেন্ট কমিটির দায়িত্বশীলরা কোন খুঁটির জোরে অথবা ভয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে হাইকোর্টের রুলকে অবহেলা করে সংগঠনের মূল ধন (ক্যাপিটাল ফান্ড) এবং এর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, তা সদস্যদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। যে সংগঠনটি দুই যুগের বেশি সময় ধরে বিশ্বনাথের মেধাবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে আসছে, উচ্চাবিলাসী কিছু ব্যক্তির অবৈধ ফায়দা হাসিল ও বেআইনি কার্যক্রমকে ধামাচাপা দিতে সংগঠনের মূল ধন (ক্যাপিটাল ফান্ড) বেহাত এবং এর কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্থ না হয় তার জন্য ট্রাস্টের ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং সদস্যবৃন্দের কার্যকরী ভূমিকা রাখা জরুরি বলে মনে করেন সচেতন বিশ্বনাথবাসী ।