পয়সাওয়ালা হলেই অনেকে মানবিক হতে পারেন না’

বিশ্বনাথে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল হকের ব্যক্তি উদ্যোগে করা গ্রামের বাসিন্দাদের চলাচলের রাস্তা, মসজিদ ও মাদরাসা। ছবি-সালমান ফরিদ

পয়সাওয়ালা হলেই অনেকে মানবিক হতে পারেন না। সমাজের জন্য কাজে আসেন না বরং নিজের ভোগবিলাসেই ডুবে থাকেন। কিন্তু সবাই এরকম নন। সমাজে এমনও অনেক বিত্তবান আছেন, যারা এক সাথে সবার কথা ভাবেন। মাটি ও মানুষের জন্য কোনো শর্ত ছাড়াই কাজ করেন। কোনো বিনিময়ের আশায় নন। করেনও না।

আমাদের গ্রামে (সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার গন্ধার কাপন গ্রামে) তেমনই এক হৃদয়বান মানুষ আছেন, যিনি কোনো বিনিময় ছাড়া, শর্ত ছাড়া ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের কষ্টে ব্যথিত হোন, এগিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাশে দাঁড়ান। সমাজের উপকার হয় এমন কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন।

আবদুল হক। ইংল্যান্ড প্রবাসি। ছবি দুটি তার বাড়ির পাশ থেকে তোলা। যে রাস্তাটা দেখছেন, পাকা! আরসিসি ঢালাই। না না, ভেবে নেবেন না, এটি সরকারের কেউ করে দিয়েছে! সেটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত অর্থায়নেই করা। কিন্তু এটি পারিবারিক রাস্তা হিসেবে ব্যবহার হয় না। গ্রামের অর্ধেক বাসিন্দাদের চলাচলের একমাত্র রাস্তা এটি। এমনকি পাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও এই রাস্তা ব্যবহার করেন। আর ওই যে সমানে পাকা ৩ তলা মসজিদ দেখা যাচ্ছে, সেটি আসলে একটি কমপ্লেক্স। তিনি তার মরহুম পিতার নামে নিজের জমিতে সম্পূর্ণ নিজের টাকায় গড়ে তুলেছেন মকদ্দুস আহমদ হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদ! এটি সম্পূর্ণ আবাসিক এবং এখানে বিনা বেতনে পড়াশোনা হয়। এই মাদরাসা ও মসজিদ পরিচালনা, শিক্ষকদের বেতন, আবাসিকে সবার তিন বেলা খাবারসহ যাবতীয় ব্যয় তিনি একাই বহন করেন। তার অবর্তমানে যাতে এটি অব্যাহত থাকে, তিনি সেই ব্যবস্থাও করে রেখেছেন!

তার বসতবাড়ির ঠিক পাশেই আছে আরেকটি বাড়ি। সেটিও কেনাসূত্রে তার। বিশালবাড়ি। ৫ টি পরিবার থাকেন এখানে। এমনকি বাড়ির সাকসবজি, পুকুরের মাছ, ফলমূলে তাদেরই অধিকার। এর জন্য কোনো টাকা গুনতে হয় না। এমন কি তাদের যে কারো বিয়ে, অসুখে-বিসুখে সবচেয়ে বড় অনুদানটা আসে তার কাছ থেকেই। তিনিই প্রথম এগিয়ে আসেন এবং তারাও তাকে নিজেদের অভিভাবকই ভাবেন! এই ৫ টি পরিবারের সবাই হিন্দু ধর্মের অনুসারী। আমাদের গ্রামের একমাত্র হিন্দু বাড়ি! আবার মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের সামনে ব্রিজের পাশে হিন্দু ধর্মের অনুসারী দুটি পরিবারের বাস ছিল। সেই জায়গার মালিকরা তাদের উঠিয়ে দিলে তিনি মাদ্রাসার সামনে তার একখণ্ড জমিতে ঘর বানাতে সহায়তা করে থাকার জায়গা করে দেন। গ্রামের বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবার তাদের সহায়তায় দিনপাত করে। এই করোনাকালেও তারা দুই লক্ষাধিক টাকার ত্রাণ একেবারেই নীরবে গরীবদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। বাইরের মানুষ তা একেবারের টের পায়নি!

অথচ সমাজহিতৈষী এসব কাজ করলেও তা কখনই তারা বলেন না। বলে বেড়ানও না। নীরবে করে যান। দেশে তার এই কাজটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে, কোনো রকম বিরক্তি ছাড়া, মানবিক মন নিয়ে আনজাম দেন তারই ছোটভাই ইনামুল হক। তিনিও মনের দিক দিয়ে অনেক বড়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তার নিজের কোন দরকার না হলেও তিনি অর্ধ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করে একটি ব্যবসা শুরু করেন। সেখানে নিয়োগ দেন নিজের ও প্রতিবেশি গ্রামের গরীব পরিবারের ১২ তরুণকে। তাদেরকে এককালীন বা ভেঙে ভেঙে সহায়তা দেয়ার চেয়ে এভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করে তাদের মানসিক ও আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন!

এই মানুষগুলো যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে, ততদিন এই পৃথিবী সুন্দর থাকবে। মানুষ বাঁচবে। আল্লাহ তাদের নেক হায়াত দান করুক।

ক্ষমা প্রার্থনা: আমি জানি এই লেখা তাদের দৃষ্টিগোচর হলে তারা নাখোশ হবেন। তারা যা প্রচার হোক চান না, যা লুকিয়ে রাখেন তা প্রকাশ করে দিয়েছি আমি! এজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। শুধুমাত্র পয়সাওয়ালা আরও মানুষ যেন সমাজের উপকারে এবং মানুষের জন্য এগিয়ে আসেন সেই উৎসাহ দিতেই এই লেখা! কেননা এমন মানবিক মানুষ এখন সমাজে বিরল। তাদের সংখ্যা কমে এলে যে পৃথিবী টিকে থাকার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেবে!

সাংবাদিক সালমান ফরিদের ফেসবুক ওয়া্ল থেকে লেখাটি নেওয়া হয়েছে।